পায়ে হেঁটে সুরমা নদী পাড়ি

স্রোতঃস্বিনী সুরমা নদী দিয়ে একসময় চলত বিশাল আকারের লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজ। সুরমার সেই যৌবন এখন আর নেই। দখল, দূষণ আর দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় পলি পড়ে সুরমা নদী এখন মৃতপায়।

বর্ষায় প্রাণ ফিরে পেলেও শুষ্ক মৌসুমে সুরমা রূপ নেয় নালায়। স্থানে স্থানে জেগে ওঠে বিশাল চর। তখন হেঁটেই এপার-ওপার আসা-যাওয়া করা যায়। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সিলেট

নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে উল্টো ছড়া-খাল দিয়ে পানি প্রবেশ করে নদীতীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়। ফলে সুরমা বাঁচাতে জোরালো হচ্ছে নদী খননের দাবি।

জানতে চাইলে সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সুরমা নদী খনন না হওয়ায় নগরীর জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কয়েকবার নদী খননের জন্য অনুরোধ জানানোর পরও উদ্যোগ নেয়নি।

ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশিত না হয়ে উল্টো নদীর পানি নগরীর ভিতরে ঢুকে পড়ে। এতে নদীর তীরবর্তী লোকজনকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। জকিগঞ্জ উপজেলার আমলসীদ এলাকা দিয়ে ভারত থেকে বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুরমা ও কুশিয়ারা নাম ধারণ করে দুই নদী দুদিকে বয়ে যায়। সুরমা নদী কানাইঘাট ও গোলাপগঞ্জ হয়ে সিলেট নগরীর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একসময় সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যে এই নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নদীর তীরে গড়ে ওঠে অসংখ্য হাট-বাজার ও গঞ্জ। সিলেট নগরীও গড়ে ওঠে এই সুরমার তীর ঘেঁষে। কালের পরিক্রমায় এই সুরমা হারিয়েছে যৌবন। হারিয়েছে গতি ও পথ। সুরমার বাঁকে বাঁকে জেগে ওঠেছে বিশাল চর। চরজুড়ে কোথাও চলছে ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট।

আর কোথাও চরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশু। গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ী বৈটিকর-দক্ষিণবাঘা খেয়াঘাট নদীর ব্যস্ততম পয়েন্ট। একসময় এই খেয়াঘাটে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করতেন নৌকার মাঝিরা। খেয়া পারাপারে মুখর থাকত নদীর ঘাট।

কিন্তু এখন ঘাট থাকলেও নেই খেয়া নৌকা। সুরমার এই অংশ দিয়ে চলাচল করে না নৌকাও। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় খেয়া নৌকার পরিবর্তে মানুষ এখন নদী পার হন হেঁটে। একই অবস্থা সিলেট নগরীর কুশিঘাট এলাকায়। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ হেঁটে পার হন এপার-ওপার।

শুধু গোলাপগঞ্জের বৈটিকর-দক্ষিণবাঘা খেয়াঘাট বা নগরীর কুশিঘাট এলাকাই নয়। নানা স্থানে শুষ্ক মৌসুমে অস্তিত্ব হারিয়েছে সুরমা। নদীর বুকে শোভা পাচ্ছে ধু-ধু বালুচর কিংবা সবুজ ঘাস আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ মাঠ।

একসময় এই নদী সিলেট নগরী ও নগরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হলেও এখন এটি পরিণত হয়েছে অভিশাপে। দীর্ঘদিন ধরে সুরমা নদী খনন না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে।

নগরীর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ছড়া ও খাল দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় সুরমা ফুলেফেঁপে ওঠে। নদীর পানি ছড়া ও খালের লেভেলের ওপরে ওঠে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে উল্টো নগরীতে নদীর পানি ঢুকে পড়ে। ফলে বর্ষাকালে নগরীর উপশহর, সাদাটিকর, ছড়ারপাড়, মাছিমপুরসহ সুরমার তীরবর্তী এলাকা পানিতে নিমজ্জিত থাকে। দেখা দেয় দীর্ঘ জলাবদ্ধতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *