আরব পিস ইনিশিয়েটিভ: বাস্তবায়িত হলে বদলে যেত ফিলিস্তিনের ভাগ্য

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান হলেও এর সমাধানে আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে।,,,

বরং দিনে দিনে বেড়েছে ইসরায়েল কর্তৃক দখলকৃত ভূমির পরিমাণ, বেড়েছে ফিলিস্তিনিদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন, হয়েছেন বাস্তুহারা এবং তাদের কান্নায় ভারী হয়েছে জেরুজালেমের আকাশ।তবে এই সংঘাত সমাধানের চেষ্টা যে করা হয়নি তা কিন্তু নয়।

বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ, আরব রাষ্ট্রসমূহ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের সমাধানের চেষ্টা করলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। সেই প্রচেষ্টার সর্বশেষ সংযোজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণীত তথাকথিত

১৮১ পৃষ্ঠার এই মার্কিন প্রস্তাবনায় ফিলিস্তিনি দাবিগুলোকে অগ্রাহ্য করে, একতরফাভাবে ইসরায়েলি স্বার্থ নিশ্চিত করা হয়েছে বিধায় বিশ্লেষকগণ এটিকে অবাস্তব এবং অন্তঃসারশূন্য বলে উল্লেখ করেন। তবে আজ পর্যন্ত এই সংঘাতের সমাধান কল্পে যতগুলো প্রস্তাবনা এসেছে তন্মধ্যে সবচাইতে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত ছিল আরব পিস ইনিশিয়েটিভ তথা আরব শান্তি উদ্যোগ।

শুরুর কথা

১৯৮১ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স ফাহাদ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে একটি প্রস্তাবনা প্রকাশ করেছিলেন। যেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখলকৃত আরব ভূমি থেকে পুরোপুরি চলে যাবে, বিনিময়ে আরব রাষ্ট্রসমূহ ইসরায়েলকে ‘রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি’ দেবে। এটি ছিল আরব শিবির থেকে উত্থাপিত সর্বপ্রথম কোনো প্রস্তাবনা। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক-ইরান যুদ্ধের (১৯৮০-৮৮) ডামাডোলে সেই প্রস্তাবনা হারিয়ে যায়।

সেই ঘটনার দুই দশক পর, ২০০২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক থমাস ফ্রিডম্যানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ (যিনি পরবর্তীতে সৌদি বাদশাহ হিসেবে অধিষ্ঠিত হন) প্রায় অনুরূপ একটি প্রস্তাবনা প্রকাশ করেন।

ক্রাউন প্রিন্স আব্দুল্লাহের সেই প্রস্তাব ২০০২ সালের ২৭-২৮ মার্চে লেবাননের বৈরুতে অনুষ্ঠিত আরব লীগের সম্মেলনে সামান্য পরিবর্তনসহ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে প্রস্তাব করা হয়। এটিই ইতিহাসে সৌদি পিস ইনিশিয়েটিভ বা আরব পিস ইনিশিয়েটিভ (Arab Peace Initiative- API) নামে পরিচিত।

তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স আব্দুল্লাহ যিনি আরব পিস ইনিশিয়েটিভ পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড;

কী ছিল এতে?

১. ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখলকৃত পশ্চিম তীর, গাজা, গোলান মালভূমি এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করবে।

২. ৪ জুন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান সীমানাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করে গাজা এবং পশ্চিম তীরকে নিয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হবে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম।

৩. জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজোলিউশন ১৯৪ অনুসারে ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যার সমাধান করা হবে।

রেজোলিউশন ১৯৪ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদেরকে নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার দেয়। ইসরায়েল উপরোক্ত এই শর্তসমূহ মেনে নেওয়ার বিনিময়ে আরব রাষ্ট্রসমূহ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবে, আরব লীগের সকল সদস্য-দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, আরব-ইসরায়েল সংঘাত সমাপ্ত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এই অঞ্চলের সকল রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ১৯৮১ সালের প্রস্তাবনায় উল্লেখিত ‘রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি’ দানের পরিবর্তে এবারের প্রস্তাবনায় ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন’ (Normal Relations) টার্ম ব্যবহার করা হয়।

এই শান্তি উদ্যোগের মূল প্রস্তাবটি করা হয়েছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ২৪২ এবং ৩৩৮ এর ভিত্তিতে যেখানে আরব ভূমি থেকে ইসরায়েল নিজেকে প্রত্যাহারের বিনিময়ে ‘প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর’ সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল।

কী ছিল এতে?

১. ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখলকৃত পশ্চিম তীর, গাজা, গোলান মালভূমি এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করবে।

২. ৪ জুন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান সীমানাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করে গাজা এবং পশ্চিম তীরকে নিয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হবে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম।

৩. জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজোলিউশন ১৯৪ অনুসারে ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যার সমাধান করা হবে।

রেজোলিউশন ১৯৪ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদেরকে নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার দেয়। ইসরায়েল উপরোক্ত এই শর্তসমূহ মেনে নেওয়ার বিনিময়ে আরব রাষ্ট্রসমূহ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবে, আরব লীগের সকল সদস্য-দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, আরব-ইসরায়েল সংঘাত সমাপ্ত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এই অঞ্চলের সকল রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ১৯৮১ সালের প্রস্তাবনায় উল্লেখিত ‘রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি’ দানের পরিবর্তে এবারের প্রস্তাবনায় ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন’ (Normal Relations) টার্ম ব্যবহার করা হয়।

এই শান্তি উদ্যোগের মূল প্রস্তাবটি করা হয়েছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ২৪২ এবং ৩৩৮ এর ভিত্তিতে যেখানে আরব ভূমি থেকে ইসরায়েল নিজেকে প্রত্যাহারের বিনিময়ে ‘প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর’ সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সমর্থন

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া পরিকল্পনাটির প্রতি মৌখিক সমর্থন ব্যক্ত করে। এছাড়া জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠান থেকেও এটিকে সমর্থন করা হয়। জাতিসংঘ তৎকালীন মহাসচিব বান কি-মুন বলেছিলেন, “শান্তি প্রক্রিয়ায় আরব পিস ইনিশিয়েটিভ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ… এটি এই বার্তা দেয় যে, আরবরা শান্তি অর্জনের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।” ২০০৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বারাক ওবামা বলেছিলেন, “মুসলিম বিশ্বের সাথে শান্তি এনে দেবে এমন একটি চুক্তিকে অস্বীকার করা ইসরায়েলিদের জন্য পাগলামি হবে।”

২০০৬ সালে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত ওআইসির (Organisation of Isamic Cooperation-OIC) ৩৩তম সম্মেলনেও এই শান্তি উদ্যোগকে সমর্থন করা হয়েছিল।

বিস্মৃতি এবং পুনরুত্থান

প্রস্তাবনা উত্থাপনের পর এই অঞ্চলে সংগঠিত বেশ কিছু ঘটনাবলির কারণে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হতে এটি হারিয়ে যেতে শুরু করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণটি চিহ্নিত করা যায় তা হল প্রস্তাবনা উত্থাপনের সময়কাল। এই শান্তি পরিকল্পনা এমন সময়ে প্রণয়ন করা হয়েছিল যখন ফিলিস্তিন জুড়ে পূর্ণোদ্যমে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জাগরণ) চলছিল।

উপরন্তু, লেবাননের বৈরুতে যেদিন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব করা হয় তার আগের দিন ইসরায়েলের নেটনিয়া শহরের পার্ক হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে যার দায় স্বীকার করে হামাস। দিনটি ছিল ইহুদি বিশ্বাস অনুযায়ী একটি পবিত্র দিন যেটি ইহুদিরা পাসওভার নামে পালন করে। এই উৎসবে ইহুদিরা বিশেষ খাবার-দাবারের

সেদিন পার্ক হোটেলে পাসওভার উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবেই বোমা হামলাটি সংগঠিত হয়েছিল। এতে ২৮ জন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৫০ জন আহত হয়। এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে ইসরায়েল পশ্চিম তীরে Operation Defensive Shield নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে, যে অভিযানে প্রায় ৫০০ ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং ৩০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়। ইসরায়েলি সরকার এই ইন্তিফাদা ঠেকাতে এবং হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দমন করতে পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করার ফলে প্রস্তাবনা থেকে মনোযোগ সরে যায়।

উপরন্তু, ২০০৩ সালে বুশ প্রশাসন একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করে, যে পরিকল্পনায় পরবর্তীতে রাশিয়া, জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্ত হয়। তখন Middle East Quartet নামে পরিচিতি পাওয়া এই চার পক্ষ যৌথভাবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট নিরসনের চেষ্টা করে যা শান্তির জন্য রোডম্যাপ নামে পরিচিত। কিন্তু সে পরিকল্পনাটিও শুরুতেই ব্যর্থ হয় যায়। রোডম্যাপ পরিকল্পনা প্রবর্তনের ফলে রাজনৈতিক আলাপের বিষয়বস্তু থেকে আরব পিস ইনিশিয়েটিভ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রধান ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু, ২০০৫ সালে গাজা হতে ইহুদি বসতি উচ্ছেদ এবং ২০০৬ সালে ইসরায়েলের নির্বাচন এপিআই এর বিস্মৃতিতে ভূমিকা পালন করেছিল। তবে ২০০৬ সালে সংগঠিত হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করলে ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে।

উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলে ইসরায়েল মিশর, জর্ডান এবং সৌদি আরবের মতো মডারেট আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে, যার অংশ হিসেবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট ২০০৬ এর নভেম্বরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে একটি “উন্মুক্ত, বাস্তব, প্রকৃত এবং আন্তরিক সংলাপের” আয়োজন করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “যে ঘটনাগুলো আগে ঘটেনি সেগুলো এখন ঘটছে এবং পরিণত হচ্ছে। এই সুযোগকে আমাদের বিজ্ঞতা এবং দায়িত্বের সাথে কাজে লাগানো প্রয়োজন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *