৯০ বছর পর আবারও বিয়ের পিঁড়িতে প্রবীণ দম্পতি

বংশধরদের মঙ্গল কামনায় বেদমন্ত্র পড়ে আবারো বিয়ে করেছেন শতবর্ষী স্বামী-স্ত্রী। কার্ড ছাপিয়ে বিয়ের নিমন্ত্রণ দেওয়া হয় আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের।

গত রোববার রাতে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম দক্ষিণ মেড়াগাঁওয়ে ধুমধাম করে সম্পন্ন হয়েছে ব্যতিক্রমী এ বিয়ে। তিন দিন ধরে চলে ভোজনের আয়োজন।

বিবাহবাসরে সনাতনী এ বেদমন্ত্র দিয়ে বরাবরই হিন্দু সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা বিয়ে সম্পন্ন করেন। তবে এবার এই বেদমন্ত্র পড়ে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন শতবর্ষী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। বিয়ের আয়োজনে ছিল না কোনো কমতি। বিবাহবাসরে ব্রাহ্মণ দিয়ে শুধু বেদমন্ত্রই নয়, নাচ-গান, বাদ্য-বাজনা আর সনাতন রীতিতে ধুমধামের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে এই বিয়ে।

বর দক্ষিণ মেড়াগাঁও গ্রামের স্বর্গীয় ভেলগু দেবশর্মার ছেলে বৈদ্যনাথ দেবশর্মা (১০৭)। আর কনে তারই ৯০ বছর আগে বিয়ে করা স্ত্রী পঞ্চবালা দেবশর্মা (১০১)।

বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে তিনি উল্লেখ করেন ‘পরম করুনাময় ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় আমার বয়স ১০৭ বছর। আমার স্ত্রী শ্রীমতি পঞ্চবালার সহিত প্রায় ৯০ বছর আগে বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। আমাদের বিবাহের পঞ্চম পীড়ি (পাঁচ প্রজন্ম) উত্তীর্ণ হওয়ায় ৮ ফালগুন এক সনাতনী বেদমন্ত্র উচ্চারণে ‘যদিদং হৃদয়ং মম-তদিদং হৃদয়ং তব’ পুনঃবিবাহ মিলনের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হবে। উক্ত পুনঃবিবাহ মিলন ও প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে আমার নিজ বাসভবনে উপস্থিত থাকার বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম। ত্রুটি মার্জনীয়। ’

শতবর্ষী এই বর-কনের বিয়ের প্রস্তুতি চলে মাসব্যাপী। এ আয়োজনের পর রোববার রাত ৮টায় বর আসেন গাড়িতে চড়ে। যথারীতি পূজাপার্বণের মাধ্যমে বরকে বরণ করে নিয়ে বসানো হয় বিবাহবাসরে এবং সাজিয়ে-গুছিয়ে তার পাশেই বসানো হয় কনেকে। এরপর ব্রাহ্মণ নিয়মে উচ্চারণ করা হয় সনাতনী বেদমন্ত্র। এভাবেই সনাতনী রীতিতে মালাবদলসহ সবরকম আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ে।

বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া বৈদ্যনাথ তার বিয়ের কার্ডে বয়স ১০৭ উল্লেখ করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স ৯২ বছর। এ বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বয়স ভুল আছে। তার পিতা স্বর্গীয় ভেলগু দেবশর্মার হাতে লিখে যাওয়া জন্মতারিখ অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ১০৭ বছর।

তিনি বলেন, বিয়ের পাঁচ প্রজন্ম পার হয়েছে। এজন্যই ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী আবার এ বিয়ে। বংশধরদের মঙ্গলের জন্যই এ বিয়ের আয়োজন। এক বিঘা জমি বিক্রি করে কনের পিতাকে ১৩ টাকা পণ দিয়ে বিয়ে করেছিলেন স্ত্রী শ্রীমতি পঞ্চবালাকে।

বিয়ের পিঁড়িতে বসে বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া কনে পঞ্চবালা দেবশর্মা জানালেন, ছোটবেলায় বিয়ে সম্পন্ন হওয়ায় বিয়ে কী তা তিনি বোঝেননি। কিন্তু এবার এ বিয়েতে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন তিনি। বংশধররাও যাতে তাদের মতো দীর্ঘজীবী হয় এজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন তিনি।

বৈদ্যনাথ দেবশর্মার একমাত্র মেয়ে বৃদ্ধা ঝিনকো বালা দেবশর্মা জানান, তার পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান তিনি। তারই নাতি-নাতনি আবার তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিসহ মোট ৪টি প্রজন্ম পার করছেন। আর তার বাবা-মা পার করছেন পাঁচটি প্রজন্ম। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ভবিষ্যৎ বংশধরদের কল্যাণেই এ বিয়ের আয়োজন করেছেন তারা। আর এ বিয়ের আয়োজন করতে পেরে পরিবারের সদস্যরা সবাই খুশি ও আনন্দিত। তাই তারা বিয়ে অনুষ্ঠানের কোনো কমতি রাখেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *